মুখবন্ধ
জঙ্গলমহল। আপাত মাঝারি বহরের একটা শব্দবন্ধ মনে হলেও ঘটনার ঘনঘটা, বহুবিচিত্রের সাক্ষ্য বহনা করা ইতিহাস এই জঙ্গলমহলকে তার নিজস্ব ছন্দেই স্বতন্ত্র করে রেখেছে। একটা সময় ব্রিটিশ শাসকদের রক্তচক্ষুও গোটা জঙ্গলমহলকে তটস্থ করে রেখেছিল। তাই তো, চুয়াড় বিদ্রোহ থেকে শুরু করে সিপাহী বিদ্রোহ কোন আগুনের আঁচ থেকেই জঙ্গলমহলের বাসিন্দারা নিজেদের দূরে রাখেননি। তেমনি হাল আমলেও সারা দেশেই দাগ কেটেছিল আরেক ঘটনা পরম্পরা। একুশ শতকের প্রথম থেকেই মাওবাদী আন্দোলন ব্যাপক ভাবে তটস্থ করে রেখেছিল জঙ্গলমহলকে। সেসময় খুন, হত্যা ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, একেবারে যেন রোজনামচা। বহুবিধ ঘটনার সাক্ষী জঙ্গলমহলের সমাজ ও সংস্কৃতিও যেন আপন গতিতে চলে। সামাজিক জীবন যাপন, রীতি নীতি থেকে শুরু করে লোকসংস্কৃতি কিংবা হস্ত শিল্প সব কিছুতেই একটা আলাদা বৃত্ত রয়েছে, যা জঙ্গলমহলকে স্বতন্ত্র করে রেখেছে।
এক ঝলক ফিরে দেখা যাক; সালটা ১৮০৫। ব্রিটিশকালের ইষ্ট ন্ডিয়া কোম্পানির শাসনাধীনে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি “জঙ্গল মহল” নামের এক জেলা গঠন করে, এই জঙ্গলমহল জেলার মধ্যেই আমাদের পুরুলিয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার কয়েক দশক পরে ১৮৩৩ সালে, জঙ্গল মহল জেলা ভেঙে দেওয়া হয় আর সাথে সাথেই “মানভূম” নামে একটি নতুন জেলার জন্ম হল। সেদিনের মানভূম জেলার সদর দপ্তর ছিল ‘মানবাজারে’। সেই ইতিহাস প্রসিদ্ধ মানবাজার বছর কয়েক আগে মহকুমা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, মহকুমাস্তরীয় যাবতীয় প্রশাসনিক কাঠামো এই মানবাজারেই। মানভূম জেলা গঠনের পর মানবাজার সদর শহর হলেও মাত্র কয়েক বছর পরেই, ১৮৩৮ সালে মানবাজার থেকে সদর শহর স্থানান্তরিত হয়। কাঁসাই নদী সংলগ্ন ‘পুরুলিয়া’ সদর শহর হিসেবে গড়ে উঠে। তারপর কাঁসাই নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে যায়। ১৮৫৮ সালের আইনে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে, গড়ে উঠে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি। পরবর্তীকালে ১৯১১ সালের এক আইনে বিহার ও উড়িষ্যা নামের দুই প্রদেশের ঘোষণা হয়। তার ঠিক পরের বছর মানে ১৯১২ সালে বিহার ও উড়িষ্যা দুটি প্রদেশ সরকারি ভাবে কার্যকর হয়। সেই সাথেই ‘মানভূম’ ‘বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি’ থেকে বেরিয়ে যায় আর নবগঠিত বিহার প্রদেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়। ভারত স্বাধীন হবার পর রাজ্য গঠন করাটা সেসময় বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছিল দেশনেতাদের কাছে। ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুনর্গঠন এর মূল ভিত্তি ছিল ভাষা। ভাষা আন্দোলনের রেশ আছড়ে পড়ে এই মানভূমে। মানভূম তখন অনেক বড় এক জেলা। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, বর্ধমান, বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের ধানবাদ, ধলভূম এবং উড়িষ্যা রাজ্যের সরাইকেলা এবং খরসওয়ানের কিছু অংশ বৃহত্তর মানভূমের মধ্যেই অঙ্গিভূত ছিল। যেটা বলছিলাম, ভাষা আন্দোলনের রেশ সাবেক মানভূমে প্রবল ভাবে ঝড় তোলে। মানবাজারের পুঞ্চা থেকে পদব্রজে কোলকাতা পর্যন্ত মিছিল হয়। ১৯৫৬ সালে মানভূম জেলা রাজ্য পুনর্গঠন আইন এবং বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ (অঞ্চল স্থানান্তর) আইন ১৯৫৬ এর অধীনে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে এলাকার বিন্যাস ঘটে বিভক্ত হয়। ১ লা নভেম্বর, ১৯৫৬ সালে বিহার থেকে আলাদা হয়ে পুরুলিয়া নামের বর্তমান এই জেলার জন্ম হয়। এখনো প্রতি বছরের ১ লা নভেম্বর পুরুলিয়ার জন্মদিন নানান জায়গায় পালিত হয়। সেই পুরুলিয়া তথা সাবেক মানভূম এবং জঙ্গলমহলের শিল্প, সংস্কৃতি, মানুষের জীবন যাপন, সামাজিক রীতি রেওয়াজ থেকে যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষের অভাবী জীবন ও উত্তরণের লড়াই হোক কিংবা ধামসা মাদলের বোল থেকে শুরু করে ছৌ, ঝুমুর, টুসু, ভাদু, করমের সাথে জঙ্গলমহলের নাড়ির স্পন্দন। সেই স্পন্দনকেই ধরার চেষ্টা, এই বইয়ের মাধ্যমে।
-: সূচীপত্র :-
(১) জনজাতির শিক্ষার সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান: প্রসঙ্গ পুরুলিয়া
আফরোজ আনসারী
(২) করম পরব: কৃষি সভ্যতার সূচনা উৎসব
অনুশীলা মাহাত
(৩) নাচনী নাচ: পুরুলিয়ার সাবেক লোকসংস্কৃতি ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
অর্পিতা মন্ডল
(৪) প্রকৃতি প্রেম ও করম পরব
অরূপ মাহাত
(৫) গণশিক্ষার প্রসারে ছৌ নৃত্যের অবদান
অষ্ট সাঁতরা
(৬) নারীর সামাজিক অবস্থান ও ক্ষমতায়নে ভাদু পরব
ববিতা মাহাত
(৭) পুরুলিয়ার পর্যটন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
চিত্রা মাহাত
(৮) প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে: পুরুলিয়ার আদিবাসী প্রবীণদের সামাজিক নেতৃত্ব এবং ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণে অবদান
দেবজিত দেওঘরিয়া
(৯) লোক ঐতিহ্যের রঙে জঙ্গলমহল: দেওয়ালচিত্রের তাৎপর্যপূর্ন বিশ্লেষণ
দুর্গা চরণ মাহাতো
(১০) ভাদু গান এবং সামাজিক সচেতনতা
ফারহাত আলিম
(১১) বাঁদনা পরব: জঙ্গলমহলের ঐতিহ্যবাহী উৎসব
গুল্ম প্রসাদ মাহাত
(১২) অসামান্য কাব্যিক প্রতিভা সুনীল মাহাত
জয়ন্ত মাহাত
(১৩) মন্দিরনগরী বিষ্ণুপুর: জঙ্গলমহলের অসামান্য ঐতিহ্য
জয়শ্রী মাহাত
(১৪) পুরুলিয়ার পর্যটন
ঝর্ণা মাহাত
(১৫) নারী শিক্ষার সমস্যা ও তার প্রতিকার: প্রসঙ্গ জঙ্গলমহল
জ্যোৎস্না মাহাত
(১৬) পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়া: পুরুলিয়া ছৌ-এর পথ প্রদর্শক
কবিতা মাহাত
(১৭) ছৌ নৃত্য ও পুরাণ: একটি ব্যাখ্যাধর্মী অন্বেষণ
কনকলতা মাহাত
(১৮) নাটুয়া: এক নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
খোকন চন্দ্র মাহাত
(১৯) টুসু: পুরুলিয়ার ঐতিহ্যবাহী লোক উৎসব
মাধুরী মাহাত
(২০) ঐতিহ্য ও অনন্যতার মিশেলে পুরুলিয়ার দুর্গাপূজা
মথন কুমার
(২১) ভারতের আদিম জনজাতি শবর’দের সেকাল-একাল
পার্থ চেল
(২২) ভাষা আন্দোলন ও পুরুলিয়ার বঙ্গভুক্তি
পূর্ণিমা রুহিদাস
(২৩) কুড়মি সম্প্রদায়ের বিবাহ রীতি ও সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা
রামকৃষ্ণ মাহাত
(২৪) জঙ্গলমহলের মেলা ও গ্রামীণ অর্থনীতি
সবিতা দুয়ারী
(২৫) পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতি ও ঝুমুর
শকুন্তলা মাহাত
(২৬) ভারতীয় ঐতিহ্যমূলক জ্ঞান পরম্পরা, ছৌ-নৃত্য এবং মূল্যবোধের শিক্ষা
শম্ভু মাহাত
(২৭) টুসু গীত: এক বহুমাত্রিক অন্বেষণ
শিল্পী মন্ডল
(২৮) বাঁদনা: প্রান্তজনের মহোৎসব
সোমা মাহাত
(২৯) পুরুলিয়ার হস্তশিল্প
সুচিত্রা মাহাত
(৩০) কুড়মালি কৃষি সংস্কৃতি ও কুড়মি সম্প্রদায়
সুচিত্রা মাহাত
(৩১) ‘ঘঙ্-মুখোশ-তসর’ ত্রিবিধ শিল্পে সমৃদ্ধ পুরুলিয়া
সুজাতা মাহাত
(৩২) লোকসংস্কৃতির পীঠস্থান অহল্যাভূমি পুরুলিয়া
সুতপা মাহাত
(৩৩) ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সিধু-কানু ও বিরসা মুণ্ডার অবদান
সুতপা মাহাত
(৩৪) ভাষা আন্দোলন: মানভূমের এক গৌরবময় ইতিহাস
উত্তরা মাহাত